ভারতমাতা ।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠে যে জাতীয়তাবোধ ও দেশমাতৃকার স্বরূপ ছিল বিমূর্ত তা মূর্ত হয়ে উঠেছিল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভারতমাতা ছবিতে ।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর .

একটা নিরবয়ব ধারণা জাতীয়তাবোধ কী ভাবে জনমানসে সঞ্চারিত করা যায় এটা নিয়ে ভগিনী নিবেদিতা ভেবেছিলেন।তিনি বিশ্বাস করতেন ছবি,ভাস্কর্য ইত্যাদি প্রতীকী ভাষার মাধ্যমে সারা দেশের মানুষের মনে পৌঁছানো যায় ।নিবেদিতা একেই বলেছিলেন ‘চক্ষুর সংস্কৃতি’ বা ‘Culture of the eye’.। তাই তিনি অবনীন্দ্রনাথের ভারতমাতা ছবির স্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন ।তার মতে ভারতমাতা ছবি “ ভারতীয় কলাকৃতির ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা করে”।

সৃস্টিঃ

স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অবনীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালে এই ছবিটি আঁকেন তখন তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘বঙ্গ মাতা’।পরে ভগিনী নিবেদিতার অনুরোধে তিনি এর নাম রেখেছিলেন ভারতমাতা ।

ভারতমাতা ছবি ।

প্রেরণা: কেউ কেউ বলেছেন এ ছবির প্রেরণা ছিল ইউজিন দ্যাঁলাক্রেয়ার আঁকা ছবি ‘স্বাধীনতার দেবী’ (১৮৩০ খ্রিঃ)।

যদিও ‘ভারতমাতা’ নামে ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে কিরণ চন্দ্র ব্যানার্জির একটি নাটক অভিনীত হয়েছিল এবং বঙ্কিমচন্দ্র তার আনন্দমঠ উপন্যাসে দেশমাতৃকার স্বরূপকে তুলে ধরেছিলেন ।

অবনীন্দ্রনাথ দেশ মাতৃকার বিমূর্ত রূপকে মূর্ত করে তুলেছিলেন তার ভারতমাতা ছবিতে যেখানে ভারতমাতা একই সঙ্গে ঐশীশক্তির অধিকারিণী বা দেবী এবং মানবী আবার একই সঙ্গে অপার্থিব এবং লৌকিক ।

ছবির বর্ণনা:

অবনীন্দ্রনাথ জলরং ওয়াশ পদ্ধতিতে শান্ত অভয় ও সমৃদ্ধি প্রদানকারী মাতৃদেবীর রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন । সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মী বা অন্নপূর্ণা রূপে ভারতমাতা শিল্পীর তুলিতে আবির্ভূতা ।

নিবেদিতা ছবিটির বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন যে ভারতমাতা সবুজ পৃথিবীর ওপর দাঁড়িয়ে আছে তার পেছনে নীল আকাশ,চার কমল বিশিষ্ট পদযুগল,সশস্ত্র চারহাতে স্বর্গীয় ক্ষমতা, শ্বেত জ্যোতির্ময়ী মুখে করুণা মিশ্রিত চোখ। তিনিন্তার সন্তানদের শিক্ষা,দীক্ষা,অন্ন, বস্ত্র বিতরণ করছেন ।

এটি যেন সর্বজয়ী মাতৃ মূর্তির স্নেহময়ী রূপ। দেবী এখানে সন্ন্যাসিনীর পোশাক পরিহিতা গৈরিক বসনা।দেবীর চারহাতে রয়েছে

ওপরে বাম হাত –পুঁথি বা বই (শিক্ষা)।

নীচের বাম হাত- একটি ধানের ছড়া (অন্ন)।

ওপরের ডান হাত –একটি বস্ত্রখণ্ড (বস্ত্র)।

নীচের ডান হাত – রুদ্রাক্ষের জপমালা(দীক্ষা) ।

ভারতমাতার প্রভাব:

অবনীন্দ্রনাথ তার ‘ঘরোয়া’ নামক লেখায় উল্লেখ করেছেন স্বদেশী যুগে এই ছবি নিয়ে শোভাযাত্রা বের হতো ।

ভগিনী নিবেদিতা এই ছবিটি দেখে এতটাই উচ্ছ্বসিত হয় পড়েন তিনি মন্তব্য করেন হাতে অর্থ থাকলে নব ভারতের প্রতীক এই ছবিটি ছাপিয়ে কেদারবদ্রির আশ্রম থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত ভারতের প্রতিটি কৃষকের ঘরে একটি করে উপহার দিতেন ।

বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু এই ছবিটি আরও বড়ো করে টানিয়ে রেখেছিলেন তার বাড়িতে।

জাপানী শিল্পী ওকাকুরা ভারতমাতা ছবিটি নিয়ে বড়ো আকারে পতাকা তৈরি করেছিলেন যা কাঁধে নিয়ে শোভাযাত্রা বের হতো ।

স্বয়ং অবনীন্দ্রনাথ তার এই চিত্রকে বেঙ্গল স্কুল অব আর্ট এর মুল লোগো বা প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন ।

বিপ্লবী বিপিনচন্দ্র পাল ভারতমাতা বলতে আধ্যাত্মিক এবং হিন্দু দর্শন চিন্তাকে বুঝিয়েছেন ।

যদিও অনেকের মতে ব্রাহ্ম ও মুসলমান সম্প্রদায় হিন্দু ঐতিহ্য এবং পৌত্তলিকতার দরুন একে সাদরে গ্রহণ করেনি। কিন্তু ভারতমাতা ছবিটি সমস্ত সংকীর্ণতা সাম্প্রদায়িক প্রতীক ব্যঞ্জনার ঊর্ধ্বে উঠে দেশব্যাপী মানুষের মনে জাতীয়তাবাদের অনুভূতিকে সঞ্চারিত করেছিল।জনৈক শিল্প সমালোচক যথার্থই বলেছেন “এভাবে ভারতমাতা তার সন্তানদের মধ্যে দিয়ে মুক্তি খুঁজেছেন”

এই বিষয়ের ওপর ভিডিও লেকচার দেখার জন্য নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন ।