আইন অমান্য আন্দোলনে ভারতের নারী সমাজ।।

আইন অমান্য আন্দোলনে ভারতের নারী সমাজ।।
অসহযোগ আন্দোলনের তুলনায় আইন অমান্য আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত এবং জোরালো। এই পর্বে নারী আন্দোলন ছিল আগের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত। নিজেদের দাবি-দাওয়া এবং দেশের স্বার্থে তারা বেশ কয়েকটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। গান্ধীজীর ডাকে শুধু সমাজের উচু তলার নারী নয়, ছাত্রীসমাজ এমনকি প্রান্তিক নারীরাও আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। কারাবরণ করেছিলেন। পুলিশের অত্যাচার সহ্য করেছিলেন। গান্ধীজী ডান্ডি অভিযানে প্রত্যক্ষভাবে মহিলাদের যুক্ত করতে চাননি কারণ প্রথমত তার মনে হয়েছিল মহিলারা এই পদযাত্রা বা অভিযানে অংশ গ্রহণ করলে ব্রিটিশ সরকার প্রচার করবে ভারতীয় পুলিশের ভীতু এবং পলায়নবাদী তারা তাদের স্ত্রীদের, বোনদের বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত এই যাত্রাপথ ছিল সুদীর্ঘ নারীদের পক্ষে বিপজ্জনক। গান্ধীজী চেয়ে ছিলেন নারীরা বিভিন্ন সভা সমিতিতে অংশ নিয়ে পিকেটিং করুক, বিদেশি বা ট্যাক্স যুক্ত লবন বর্জন করুক,চরকা বুনুক,খদ্দর বিক্রি করুক।
আইন অমান্য আন্দোলনে নারীদের গ্রেপ্তার বরণ ।
আমরা এই পর্বে নারী আন্দোলনকে কয়েকটি প্রদেশে কে কেন্দ্র করে আলোচনা করব।
বম্বে : বোম্বেতে গুজরাটি মহিলাদের পাশাপাশি পারসি এবং খ্রিস্টান মহিলারা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল।
সরোজিনী নাইডু অবন্তিকা গোখলে প্রমুখরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘রাষ্ট্রীয় স্ত্রী সংঘ ‘।এই সংগঠনের মূল দাবি ছিল স্বরাজ এবং ভোটাধিকার অর্জন।
১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে গড়ে উঠেছিল “দেশ সেবিকা সঙ্ঘ”।
৬ ই এপ্রিল লবণ আইন ভঙ্গ করার সংকল্প নেন মহিলারা। অবন্তিকা গোখেল, কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায় মহিলাদের নেতৃত্ব দেন। কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায় ধারসোনা লবণ সত্যাগ্রহে আইন ভঙ্গ করেন। বোম্বে ক্রনিক্যাল অনুযায়ী প্রায় হাজারখানেক গুজরাটি মহিলা চাওপেট্টী সমুদ্রতীরে গিয়ে কলসি অন্য পাত্রে সমুদ্রের জল সংগ্রহ করেন। শুধু তাই নয় রাস্তায়,রাস্তায়,বাড়ি, বাড়ি ঘুরে দেশি লবণ ও খাদ্য বিক্রি করেন।
মে মাসে সরোজিনী নাইডু ধরসনা লবণ অভিযান করেন। লবণ আইন ভঙ্গ করেন এবং গ্রেফতার বরণ করেন।
১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে গান্ধীজীর জেল থেকে মুক্তির আগে পর্যন্ত বম্বেতে নারীরা বিদেশী পণ্যের দোকানে পিকেটিং, খদ্দরের পোশাক বিক্রি করেছিলেন। তারা পুলিশের লাঠিচার্জ কে উপেক্ষা করে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সভা এবং পতাকা উত্তোলনে অংশ নিতেন।
গান্ধীজীর জন্মদিন উপলক্ষে প্রায় পাঁচ হাজার মহিলা মানবী শৃংখল গড়ে তুলেছিলেন। নেতৃত্বে ছিলেন লীলাবতী মুন্ডিন, পেরিন ক্যাপ্টেন এবং মিসেস লুকানজি।
বাংলা : বাংলায় ত্রিশের দশকে নারী আন্দোলনের দুটি পৃথক ধারা ছিল। একদিকে ছিল অহিংস সত্যাগ্রহ এবং লবণ আইন ভঙ্গ। অন্যদিকে ছিল বিপ্লবী সশস্ত্র অভ্যুত্থান বা অভিযান।
১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে সুভাষচন্দ্র বসুর অনুপ্রেরণায় অক্সফোর্ডের শিক্ষিতা লতিকা ঘোষ করে তুলেছিলেন মহিলা রাষ্ট্রীয় স্ত্রী সংঘ। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল স্বরাজ অর্জন ও মহিলাদের অবস্থার উন্নতি ঘটানো।
১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের অধিবেশনের উদ্বোধনে সুভাষচন্দ্র বসু নির্দেশে এবং লতিকা ঘোষ এর নেতৃত্বে প্রায় ৩00 মহিলা মূলত ছাত্রী তার সুনির্দিষ্ট পোশাকে মার্চ পাস্টে অংশ নেন।
অন্যদিকে ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে উর্মিলা দেবী নেতৃত্বে জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী, শান্তি দেবী, প্রতিমা দেবী প্রমুখরা গড়ে তুলেছিলেন “নারী সত্যাগ্রহ সমিতি”।এরা কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় যেমন বড়বাজারে পিকেটিং করতেন, বিদেশী পণ্য বিক্রয় বাধা দিতেন এবং খদ্দরের পোশাক বিক্রি করতেন।
মেদিনীপুরের ঘাটাল, কাঁথি, তমলুক প্রভৃতি স্থানে নারীরা লবণ আইন অমান্য করেন।
বাংলায় কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়, বাসন্তী দেবী, উর্মিলা দেবী, সুনীতি দেবী, দুর্গা দেবী, আশালতা সেন, বীণাপাণি দেবী, জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী, সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।
মুসলিম মহিলারাও পিছিয়ে ছিলেন না জোবেদা খাতুন এর নেতৃত্বে শ্রীহট্টে “মহিলা রাষ্ট্রীয় সংঘ” সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। এতে যোগ দেন সুভাষচন্দ্র বসু, উর্মিলা দেবী, শান্তি দাস প্রমুখরা।এছাড়া এই আন্দোলনে দৌলতউন্নিসা খাতুন, রাজিয়া খাতুন, হালিমা খাতুন, হোসেন আরা বেগম প্রমুখরা অংশ নিয়েছিলেন।
মাদ্রাজ: বোম্বে ও বাংলা তুলনায় মাদ্রাজে নারী আন্দোলন খানিকটা নিস্প্রভ ছিল।
মাদ্রাসি নারী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শ্রীনিবাস আয়েঙ্গায়ারের কন্যা শ্রীমতী অম্বুজামল।১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি গড়ে তোলেন “women’s swadeshi league”।তারা স্বদেশী আদর্শ প্রচার করত, স্বদেশী দ্রব্যের প্রদর্শনী খদ্দরের তৈরি জিনিস বিক্রির ব্যবস্থা করতো।
গান্ধীজীর ডাকে সাড়া দিয়ে কৃষ্ণাবাঈ রাও দেশে সেবিকা সংঘের মাধ্যমে আন্দোলন করেছিলেন।
রকমনি লক্ষ্মীপতি লবণ আইন ভঙ্গ করতে গিয়ে কারাবরণ করেন
উত্তরভারত :
উত্তর ভারতের এলাহাবাদ, লখনৌ, দিল্লি, লাহোর, প্রতিষ্ঠান নারীরা সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল।
এলাহাবাদী জওহরলাল নেহেরুর মাতা স্বরূপরানী নেহেরু, স্ত্রী কমলা নেহেরু আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।
লাহোরে মতিলাল নেহেরুর ভাইঝি লডো রাণি জুৎসি (Lodo Rani Zutshi) এবং তার তিন কন্যা মনমোহিনী, শ্যামা এবং জনক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
দিল্লিতে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন সত্যবতী দেবী। দিল্লিতে নারীদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। আন্দোলন দমন করার জন্য পুলিশ বর্বরতার আশ্রয় নিয়েছিল।
মূল্যায়ন :
১। আইন অমান্য আন্দোলন পর্বে নারীদের অংশগ্রহণ কংগ্রেসকে শক্তিশালী করেছিল এবং সত্যাগ্রহ আন্দোলনকে জোরদার করেছিল।
২। রাজনৈতিক আঙিনায় এবং সমাজে মহিলাদের সম্মান ও মর্যাদা বেড়েছিল।
৩। নারীর আন্দোলনের পাশাপাশি নিজেদের অধিকার এবং দাবি নিয়ে সরব হন। ভোটাধিকার আইন সভায় আসন সংরক্ষণের দাবি জানান। সরলা দেবী চট্টোপাধ্যায় এই কারণে মন্তব্য করেছিলেন “ Congress assignment to women the position of law Breakers only and not lawmakers “।
এই বিষয়ে আরো জানতে নীচের ভিডিওটি দেখুন ।
এবং চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন ।।