Ideas of History
বিশ শতকে ভারতে কৃষক,শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলনঃ বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা ।

অসহযোগ আন্দোলন পর্বে কৃষক আন্দোলন ।

-->

অসহযোগ আন্দোলন পর্বে কৃষক আন্দোলন ।

ভারতের সংগঠিত কৃষক আন্দোলনের গতি বৃদ্ধি পেয়েছিল অসহযোগ আন্দোলন পর্বে মূলত ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে মধ্যবর্তী সময়ে।

কৃষক আন্দোলনে গান্ধিজি ।

এই সময় কৃষক আন্দোলনের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় –

১। কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ সাংগঠনিক স্তরে কৃষক আন্দোলনের আওতায় আনতে চেয়েছিলেন। জহরলাল নেহেরু রাজেন্দ্র প্রসাদের মতো নেতারা গ্রামের কৃষকদের মধ্যে কোন সংযোগ বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হন।

২। স্বয়ং গান্ধীজী অহিংস সত্যাগ্রহ নীতির উপর ভিত্তি করে কংগ্রেসের ছত্রছায়ায় নিয়ন্ত্রিত কৃষক আন্দোলন করার পক্ষপাতী ছিলেন।

৩। এই সময় কৃষক আন্দোলন পরিচালনা করার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মূলত বিহার যুক্তপ্রদেশ কিষান সভা গড়ে উঠেছিল। যেখানে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি স্থানীয় কৃষক নেতারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

৪। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ জনিত অর্থনৈতিক দুরাবস্থা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি অসন্তোষের গণভিত্তি রচনা করেছিল বলে মনে করেন ঐতিহাসিক রজত রায়।

৫। যদিও অধ্যাপক সুমিত সরকার মনে করেন সেই সময়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের অবসান আসন্ন এই মর্মে একটি বিশ্বাস গড়ে উঠেছিল। জনগণের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের ভাঙ্গনের পাশাপাশি রামরাজ্য গড়ে উঠছে বলে একটা বিশ্বাস গড়ে উঠেছিল। ঐতিহাসিক শাহিদ আমিন মনে করেন এই ধরনের বিশ্বাসের ফলে নিম্নবর্গীয় কৃষকদের চাপের ফলে সাংগঠনিক তরে আন্দোলন জঙ্গি রূপ ধারণ করেছিল।

আমরা আমাদের আলোচনার সুবিধার জন্য অঞ্চলভেদে আমাদের আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাব।

বিহার: বিহারের চম্পারন নীলচাষীদের কুড়ি ভাগের তিন ভাগ জমিতে নীলচাষ করতে বাধ্য করা হতো। কাঠিয়া ব্যবস্থা বলা হত। এই অবস্থায় নীলকর সাহেবরা ‘শারাহবেশী' বা বর্ধিত খাজনা ও ‘তাওয়ান’ বা থোক ক্ষতিপূরণের বোঝা চাপিয়ে দেয় । ফলো তো চাষিরা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে রাজকুমার শুক্লা গান্ধীজির সঙ্গে যোগাযোগ করে নেতৃত্বদানের আহ্বান জানান।

গান্ধীজীর চম্পারন অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন। আন্দোলনের চাপে পড়ে সরকার ‘চম্পারন কৃষি অনুসন্ধান কমিটি’ গঠন করেন। এই কমিটির সুপারিশে ‘চম্পারন কৃষি আইন’(১৯১৮) মোতাবেক তিন কাঠিয়া ব্যবস্থা উচ্ছেদ হয়।

১৯১৯ -২০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বিহারের দ্বারভাঙ্গা রাজের বিরুদ্ধে মুজ:ফরপুর, ভাগলপুর, পূর্ণিয়া,,মুঙ্গেরে গোচারণভূমি ও গাছের ওপর কর আরোপের বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্বামী বিদ্যানন্দ। প্রথমদিকে এই আন্দোলন শান্তিপূর্ণ হলেও পরের দিকে বেশ কিছু বিক্ষিপ্ত অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল।

গুজরাটের খেড়া: গুজরাটের পাতিদার এরা অর্থাৎ সম্পন্ন কৃষকরা খাজনা বৃদ্ধির ব্যাপারে আগে থেকেই বিক্ষুব্ধ ছিল। কিন্তু সমসাময়িক সময়ে ভয়ংকর খরা এবং মহামারীর ফলে সমস্ত কৃষক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এই অবস্থায় সরকার ওই অঞ্চলে রাজস্ব বৃদ্ধি করলে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। গান্ধীজীর নেতৃত্বে কৃষকরা অহিংস সত্যাগ্রহ নীতির উপর ভিত্তি করে খাজনা প্রদান বন্ধ করে। ১৯১৭-১৮ খ্রিস্টাব্দে গান্ধীজীর হস্তক্ষেপে সরকার এবং কৃষকেরা একটা মীমাংসায় আসে।

রাজস্থান : রাজস্থানের মেবারি বিজয় সিং পথিক এবং মানিকলাল বর্মার নেতৃত্বে জোরদার কৃষক আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল।

উদয়পুরে মতিলাল তেজওয়াত নামে এক মসলা ব্যবসায়ী নিজেকে গান্ধীর দূত বলে ঘোষণা করেন এবং ভিল উপজাতিদের সংগঠিত করেন।

উদয়পুরে কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জয়নারায়ন ব্যাস। উদয়পুরের মহারানার বিরুদ্ধে এই আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল, যদিও এই আন্দোলন সফল হয়নি।

বাংলা : ইউনিয়নবোর্ড বিরোধী আন্দোলন – ১৯২০-২১ খ্রিস্টাব্দে বীরেন্দ্রনাথ শাসমল এর নেতৃত্বে কাঁথি তমলুক মহকুমায় ইউনিয়নবোর্ড আরোপিত বর্ধিত খাজনার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয় এবং আন্দোলনের চাপে সরকার নতি স্বীকার করে।

বীরভূম জেলাতে ও জিতেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর নেতৃত্বে ইউনিয়নবোর্ড বিরোধী আন্দোলন হয়েছিল।

রংপুর জেলায় চৌকিদারি কর দিতে অস্বীকার করে কৃষকেরা।

রাজশাহী জেলায় গান্ধীজীর আগমন ঘটেছে এই ধারণার বসে জেল থেকে শতাধিক কয়দিন বেরিয়ে পড়ে।

১৯২২ খ্রস্টাব্দে ফেব্রুয়ারি মাসে জলপাইগুড়ি জেলার সাঁওতালরা গান্ধী টুপি পড়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ চালায়। তারা বিশ্বাস করেছিল গান্ধী টুপি পরলে বন্দুকের গুলি তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।

যুক্তপ্রদেশ : ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে ফেব্রুয়ারি মাসে মদনমোহন মালব্য সমর্থনে এবং গৌরীশংকর মিশ্র ইন্দ্রনারায়ন দ্বিবেদীর তৎপরতায় যুক্তপ্রদেশ কিষান সভা গড়ে ওঠে।১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে জুন মাসের মধ্যে 173 তহশিলে অন্তত 450 টি শাখা কার্যালয়ে স্থাপিত হয়েছিল। এই কিষান সভার কর্মসূচি ছিল।

· কৃষক ও জমিদারদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা।

· কৃষি স্বার্থরক্ষাকারী আইন প্রণয়নের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা।

· গ্রাম পঞ্চায়েত গঠন করে কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করা।

১৯২০ -২১ খ্রিস্টাব্দে যুক্ত প্রদেশের প্রতাপগড়, রায়বেরেলি, সুলতানপুর এবং ফৈজাবাদে কিষান সভার নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।

১৯২০ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে প্রতাপগড় অযোধ্যা কিষান সভা প্রতিষ্ঠিত হয়। জওহরলাল নেহেরু বাবা রামচন্দ্র দেওনারায়ন মিত্র প্রমুখ ওদের নেতৃত্বে এবং তৎপরতায় 330 টি শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

বাবা রামচন্দ্র : যুক্তপ্রদেশ কৃষক আন্দোলনের মূল কান্ডারী ছিলেন বাবা রামচন্দ্র। মহারাষ্ট্রের ব্রাহ্মণ বাবা রামচন্দ্র একজন ভবঘুরে ছিলেন। নানা জায়গা ঘুরে ১৯০৯ সালে তিনি ফৈজাবাদে আসেন। তিনি ঘুরে ঘুরে রামায়ণের গান পরিবেশন করতেন। অচিরেই তিনি কৃষক সমব্যথী এবং নেতা হয়ে ওঠেন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি জৌনপুর এবং প্রতাপগড় থেকে কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে নিয়ে এলাহাবাদে গৌরীশংকর মিত্র এবং জহরলাল নেহেরু সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি গড়ে তোলেন ‘কুর্মি ক্ষত্রিয় সভা’।

তার আন্দোলনের মূল দাবি ছিল করের পরিমাণ রাস করা, জোরজবরদস্তি কর আদায় বন্ধ করা,বেগার প্রথার অবসান, বেদখল জমি চাষ অস্বীকার,অত্যাচারী ভূস্বামীদের সামাজিক বয়কট ইত্যাদি। তার আন্দোলনের চাপে পড়ে ভূস্বামী এবং স্থানীয় সরকার দিশেহারা হয়ে চুরির দায়ে বাবা রামচন্দ্র কে গ্রেপ্তার করে।

কিন্তু এই মিথ্যে গ্রেফতারির প্রতিবাদে হাজার হাজার কৃষক প্রতাপগড় জেল অবরোধ করলে বাবা রামচন্দ্র কে মুক্তি দেয়া হয়।

কিন্তু ১৯২১ খ্রিস্টাব্দ থেকে রায়বেরেলি, ফৈজাবাদ, সুলতানপুরে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটতে শুরু করে । বাবা রামচন্দ্র কে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়। বাবা রামচন্দ্র কংগ্রেসের কাছে থেকে কোন সমর্থন পাননি। এমনকি গান্ধীজী শুরু থেকেই এই সহিংস আন্দোলনের নিন্দা করেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই বাবা রামচন্দ্র নেতৃত্বে কৃষক আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়েছিল।